আপডেট :
১১:৪৫:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৪
০
জন পড়েছেন
মু.ওয়াহিদুর রহমান মুরাদ: মেঘনা নদীতে জলদস্যুদের কবলে পড়ে নাবিক – সারেংদের কাছে অনিরাপদ রুট হয়ে দাড়িয়েছে লক্ষ্মীপুর – নোয়াখালী – চাঁদপুরের নৌ রুট। গত দেড় মাসে (ডিসেম্বর- জানুয়ারি) অন্তত ২৫টি বড় মালবাহী লাইটার জাহাজে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এ ব্যাপারে প্রতিকার চেয়ে এবং নৌ ডাকাতি বন্ধে গত ১৬ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ লাইটার জাহাজ ইউনিয়ন।
ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে মেঘনায় এখন ভোর ও কুয়াশা পড়লে দিনের বেলাতেও হানা দিচ্ছে জলদস্যুরা। জাহাজ শ্রমিক ইউনিয়নের তথ্যমতে, গত বছরের ডিসেম্বর থকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত মেঘনা নদীতে ব্যাপক হারে ডাকাতি হচ্ছে। যার বেশির ভাগই মালবাহী বড় ধরনের জাহাজে। প্রায় প্রতি রাতেই নদীর ডুবোচরগুলোতে ডাকাতি হচ্ছে। পানি কম থাকায় এখন প্রায়ই ডুবোচরে আটকে যাচ্ছে জাহাজ। আর জলদস্যুদের প্রধান টার্গেট ওইসব জাহাজ। দিনে-রাতে যখনই জাহাজ আটকে যায় জলদস্যুরা তখনই ট্রলার নিয়ে হানা দেয় জাহাজগুলোতে। ডাকাতদের প্রত্যেকটি আক্রমণে আহত হচ্ছেন নাবিক ও কর্মচারীরা।
জাহাজের মালামাল লুট করে নিয়ে যাওয়ার সময় তারা হামলা চালায় নাবিক-সারেংদের ওপর। দেড় মাসে অন্তত ২৫ জন নাবিক ও কর্মচারীকে কুপিয়ে জখম করে জলদস্যুরা।
শ্রমিক ইউনিয়ন পাঁচটি সুনির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করে ১২টি বড় ডাকাতি ও অপহরণের ঘটনার ব্যাপারে জানিয়েছে।
অন্যদিকে, গত এক মাসের ডাকাতির ঘটনার ডেটাবেজ তৈরির জন্য সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে তথ্য চেয়ে পোস্ট দিয়েছে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন। ওই পোস্টের বিপরীতে বিভিন্ন জাহাজের নাবিক ও মাস্টাররা ডাকাতির তথ্য দিয়েছেন। এতে দেখা গেছে, গত এক মাসের ব্যবধানে মেঘনার জলসীমায় অন্তত ২৫টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এসব ডাকাতির ঘটনার প্রত্যক্ষ বর্ণনা দিয়েছেন নৌযান শ্রমিকরা।
লক্ষ্মীপুরের রামগতি- কমলনগর-ভোলা জেলার মধ্যবর্তী মাইজেরচরে বেশি জাহাজ ডাকাতির কবলে পড়ছে। ডাকাতি বন্ধে ১৬ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ লাইটার জাহাজ ইউনিয়ন।
তাদের তথ্যমতে, লক্ষ্মীপুরের রামগতি-কমলনগর-ভোলা জেলার মধ্যবর্তী মাইজেরচরে বেশি জাহাজ ডাকাতির কবলে পড়ছে। এ ছাড়া চাঁদপুরের বিভিন্ন চর রয়েছে ।লক্ষ্মীপুর-ভোলার মাইজেরচরে অন্তত ১০টি বড় ধরনের ডাকাতি হয়েছে। মাইজেরচর ছাড়াও ঢাকার অদূরে মুন্সীগঞ্জের মুক্তারপুর, মেঘনাঘাট, চাঁদপুরের বাটনল,বরিশাল, ভোলা ও লক্ষ্মীপুরের সীমান্তবর্তী মেহেন্দিগঞ্জ এবং ইলিশা, কালিগঞ্জ, লক্ষ্মীপুরের রামগতির চরআবদুল্লাহ, কমলনগরের চর মাইজেরচর, নোয়াখালীর বয়ারচর এলাকায় । বর্তমানে ডাকাতরা বেপরোয়া।
তথ্যমতে, মেঘনা নদীর জলসীমা জুড়ে হচ্ছে ডাকাতিগুলো। এমভি প্রাইড অব খান জাহান আলী-৪ নামের একটি লাইটার জাহাজের কর্মচারী আরিফুল ইসলাম জানান, ১১ জানুয়ারি তাদের জাহাজটি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাচ্ছিল। রাত সাড়ে ৮টার দিকে লক্ষ্মীপুর-চাঁদপুরের সীমান্তবর্তী মাঝের চর অতিক্রম করার সময় প্রায় ২০ জনের ডাকাত দল তাদের জাহাজ – আক্রমণ করে। ডাকাতদের সঙ্গে গুলিসহ
বন্দুক ও দেশীয় ধারালো বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র ছিল। ডাকাতরা জাহাজ থেকে নগদ টাকা, নাবিকদের মোবাইল ফোন, জামা-কাপড়, জাহাজের তেল, বাজার-সদাই এবং জিপিএস নিয়ে যায়।
একই সময়ে এমভি প্রিন্স অব ঈশান জাহাজেও ডাকাতি হয় বলে জানিয়েছেন জাহাজের মাস্টার আল আমিন। এমভি আল মোস্তফা-২ এর নাবিক মেজবাহ উদ্দিন জানিয়েছেন, তার জাহাজটি গত ১৪ নভেম্বর তারিখে মাইজের চরের কাছে ডাকাতদের আক্রমণের শিকার হয়।
খাইরুল ইসলাম নামে আরেকজন জানিয়েছেন, ১৫-১৬ তারিখ দুই দিনে একই স্থানে চারটি জাহাজে ডাকাতি হয়েছে। গত ১৬ জানুয়ারি গজারিয়ায় ডাকাতির কবলে পড়ে আনোয়ার মেরিটাইম-৫ জাহাজ। এরপর ওই জাহাজের মাস্টার নূর নবীসহ ১২টি জাহাজের নাবিকরা তাদের জাহাজগুলোর নিরাপত্তা চেয়ে মালিক প্রতিষ্ঠান আনোয়ার সিমেন্ট কোম্পানির কাছে লিখিত আবেদন করেন।
২০১৯ সালে লক্ষ্মীপুরের চরমেঘা থেকে পাঁচ জেলেকে অপহরণ করে মুক্তিপণ চাওয়ার দায়ে তিন ডাকাতকে গ্রেপ্তার করেছে নৌপুলিশ। সেসময় অপহৃত পাঁচ জেলেকেও উদ্ধার করা হয়। জলদস্যুদের কাছ থেকে চারটি কিরিচ, একটি দা, দুইটি টর্চ লাইট ও একটি হ্যাজাক লাইটসহ ডাকাতির বেশকিছু সরঞ্জাম উদ্ধার করে পুলিশ। আটককৃতরা ছিলেন,ভোলার চরজঙ্গলা এলাকার কামাল, লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার চর কাচিয়া গ্রামের জাকির হোসেন ও একই এলাকার শিপন।
বাংলাদেশ লাইটার জাহাজ শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, ‘সারা বছরই নদীতে ডাকাতি হয়। প্রতি মুহূর্তে আতঙ্কে থাকতে হয়। খুব হতাশায় ভুগতে হচ্ছে। গত এক মাসে যে হারে ডাকাতির ঘটনা ঘটছে তা এক ধরনের নৈরাজ্য। স্থানীয় প্রশাসনের ওপর এখন আর আস্থা রাখতে পারছি না। তাই সংগঠনের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছি। যদি নৌপথ নিরাপদ না করা হয় তবে আমরা ধর্মঘটে যাব।’
বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন এর সভাপতি শাহ আলম ভূঁইয়া বলেন, হঠাৎ করে এত বেপরোয়া নৌ ডাকাতিতে জাহাজ মালিকরা আতঙ্কিত। মুক্তারপুর এলাকায় তিনটি নৌ পুলিশের ইউনিট থাকা সত্ত্বেও ডাকাতির ঘটনা ঘটছে।
নদীতে হঠাৎ বেপরোয়া জলদস্যুতার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ নৌ পুলিশের অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক (অ্যাডিশনাল ডিআইজি) শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘শুধু আমরাই উপকূলের প্রহরী নই, আরও অনেক সংস্থা রয়েছে। তাদেরও উপকূল পাহারা দেওয়া এবং জীবন বাঁচানোর দায়দায়িত্ব আছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’